রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন

অপরিকল্পিত পুকুর খননের অভিযোগ: জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল

মো. নাহিদুল ইসলাম ফাহিম:
  • Update Time : শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫
  • ৩৮ Time View

রাজবাড়ীতে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে শতাধিক কৃষকের প্রায় একশ একর জমির ধানক্ষেত নষ্ট হয়েছে। রাজবাড়ী জেলা সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের খালিশা-রামকান্তপুর গ্রামে এমন ঘটনা ঘটেছে। অপরিকল্পিত পুকুর খনন করে পানি প্রবাহের রাস্তায় বাধ দেওয়ার কারণেই এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।

জানা গেছে, সুলতানপুর ইউনিয়নের খালিশা-রামকান্তপুর গ্রামের মাঠে ফসল আবাদ করেন তারা। সেখান থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যেই কুমার নদ। কুমার নদের খলিলপুর থেকে খালিশা-রামকান্তপুর পর্যন্ত একটি সংযোগ খাল রয়েছে । এই খাল দিয়েই মূলত এই বিলের পানি কুমার নদে গিয়ে পরে। কিন্তু লিটন ঠাকুর নামে এক ব্যক্তি এই বিলের ভাটির কৃষি জমিতে পুকুর খনন করে বাধ নির্মান করেছেন। সেই বাধ নির্মাণের কারণে এই খালিশা-রামকান্তপুর বিলের পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টির ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বিলে প্রায় ১০০ একর জমি রয়েছে। সব জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছিল। এখন তা পানিতে ডুবে পঁচে গেছে। যদি এখনও এই পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হয় তাহলে তারা আবারও সেখানে ধান রোপন করবেন। শুধু ধান নয় জলাবদ্ধতায় ধুন্দল, মরিচ, বেগুন ও কচুজাতীয় সবজি খেতও নষ্ট হচ্ছে বলে জানান তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ী সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের সুলতানপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কিছুটা পূর্ব দিকে খালিশা-রামকান্তপুর গ্রাম। গ্রামের রাস্তার দুই পাশে বসতবাড়ি। উত্তর দিকে একটি বড় মাঠ। সেই মাঠে থৈ থৈ করছে পানি। অনেকে সেই পানিতে পাট জাগ দিয়েছেন। একটি লতি কচুর খেত পানিতে ডুবে আছে। পাশ দিয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির উপর দিয়ে কিছু উঁচু জমির ধানের গাছ ভাসতে দেখা গেছে। তবে তাতেই পঁচন ধরেছে। বিলের দুটি স্থানে ছোট কালভার্ট দেওয়া রয়েছে। এই কালভার্টের মধ্যে একটি বিএডিসির তৈরি কালভার্ট রয়েছে। বিলের শেষ মাথায় দুটি পুকুর। একটি পুকুর বেশ পুরাতন। এই পুকুরটির পাড় পানি ছুঁই ছুঁই করছে। পাশেই আরেকটি পুকুর রয়েছে। পকুরের তিনপাশে পাড় বাধা রয়েছে। আর দক্ষিণ পাশের পাড় রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পুকুরের পূর্ব এবং পশ্চিম পাশে পানির স্তরের পার্থক্য প্রায় ৩ ফুট মতো। পুকুরটি পার হলেই কুমার নদ থেকে আসা খালের শেষ অংশ। ওই খালের শেষ অংশ থেকে আরেকটি বিল। সেই বিলের পানির স্তর এই বিলের থেকে ৮ থেকে ১০ফুট নিচু। তবে সেই বিলে ধানের জমিতে ইঞ্জিনচালিত একটি ছ্যাঁলো মেশিন দিয়ে পানি দিতে দেখা যায়।

ফয়জুল তালুকদার নামে এক কৃষক বলেন, আমি এক একর জমিতে ধান রোপণ করেছিলাম। টানা বৃষ্টিতে সবই পানির নিচে চলে গেছে। আমরা প্রতিবছরই এই জমিতে ধান আবাদ করি। কিন্তু যেখান দিয়ে এই মাঠের পানি নামে সেখানে একটি পুকুর কেটে পানি যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। একারণে পানি নামতে পারছে না। যদি এখনও এই বিলের পানি নিষ্কাশন করা যায় তাহলে আমরা আবারও ধানের চারা জমিতে রোপন করতে পারবো।

কৃষক হামিদ তালুকদার বলেন, “আমি তিন বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। প্রতিকেজি ধান ৬০০টাকা করে কিনে চারা দিয়ে তারপর ধান রোপন করেছিলাম। ধান হলে ৭৫ মণ ধান উৎপাদন হতো। ধান রোপন করতেও ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন একটি ধানের গাছও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদি এবছর ধান না হয় তাহলে শুধু যে আমরা না খেয়ে মরবো তা নয়, গরু-বাছুরও না খেয়ে মরবে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে আমার ধুন্দল মরে গিয়েছে। বেগুন নষ্ট হয়েছে। মরিচের খেতও শেষ। আমার অনেক টাকার লোকসান হয়েছে।

ভুক্তভোগী কৃষক সোবাহান তালুকদার বলেন “প্রতিবছরই এই জমিতে ধান রোপণ করি। সেই ধান সারা বছর খাই। খাওয়ার পর যা বেঁচে থাকে তা বিক্রি করে সংসারে অন্যান্য চাহিদা পূরণ করি। এক মাস আগে এই জমিতে ধান রোপণ করেছি। টানা বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে সব ধান পঁচে গেছে। এই বছর জমিতে ধান না হলে সারা বছর অনেক কষ্ট করে চলতে হবে।

ফজর আলী মোল্লা নামে আরেক কৃষক বলেন “আমি আধা বিঘা জমিতে লতি কঁচু রোপন করেছিলাম। প্রতিসপ্তাহে এক হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার লতি বিক্রি হতো। এখন সবই পানির নিচে। এতে আমার বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে।
পুকুরটির মালিক লিটন ঠাকুর বলেন, পুকুরটি আমি ইজারা দিয়েছি। ইজারাদার পুকুরের পাড় কাটতে রাজি হচ্ছে না। সে পুকুরে

অনেক টাকা পয়সা খরচ করে মাছ চাষ করছে। আমি আইনের উর্ধ্বে নয়। দশজন মিলে যে সিদ্ধান্ত নিবে আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। বিষয়টি এখন প্রশাসন জানে। তাদের কাছে আমার দাবি এমন একটি পদক্ষেপ নেওয়া হোক যাতে কারও কোন ক্ষতি না হয়। আমি এলাকায় সবার সাথে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।”

রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জনি খান বলেন, “ সুলতানপুর বিলের একটি জলাবদ্ধতার খবর জানতে পেরেছি। সেখানে আমার অফিস থেকে লোক পাঠিয়েছিলাম। তারা সরেজমিন ঘুরে এসেছে। পানি নিরসনের দায়িত্ব আমার দপ্তরের না। এটা সাধারণ বিএডিসি বা এলজিইডি করে থাকে। শুধু সুলতানপুরই নয় জেলার আরও কয়েকটি স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এই জলবদ্ধতার বেশিরভাগই মানবসৃষ্ট। কোনো নিয়ম না মেনে কৃষি জমিতে পুকুর খনন করে বাধ দেওয়াতেই এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসন করে কৃষক জাতে ফসল ফলাতে পারেন আমরা আমি সেই চেষ্টাই করি।

বিএডিসি রাজবাড়ী জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। বর্তমানে এ বিষয়ে কোনো প্রকল্পও নেই আমাদের জোনে। তবে আমি অবশ্যই জলাবদ্ধতার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে উর্ধতন মহলে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানাবো।’

রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারিয়া হক বলেন, আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। একটি পুকুরের কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পুকুরটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। কীভাবে সেই জলাবদ্ধতা নিরসণ করা যায় সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলমান রয়েছে।

রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে জানানো হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2022 daily Amader Rajbari
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto kaskustoto